


“আমার সন্তান তো এখনো অনেক ছোট, এখনই কি ওকে স্কুলে দেব?
প্রি-স্কুলে দেব না কি সাধারণ স্কুলে? ”
৩ থেকে ৫ বছর বয়সী বেশিরভাগ শিশুর বাবা-মায়েরাই এই বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। বাচ্চার Pre-school Readiness জানা এজন্যেই জরুরি। আর সেই সাথে প্রি-স্কুল এর কনসেপ্টটাও বুঝতে হবে।
প্রি-স্কুল (Pre-school) কী?

প্রি-স্কুল হলো স্কুলজীবন শুরু করার আগের প্রস্তুতিমূলক ধাপ। প্রি-স্কুলে শিশুকে সরাসরি বই-খাতা, পরীক্ষা বা মুখস্থ না করিয়ে ধীরে ধীরে গান, গল্প , খেলা এরকম বিভিন্ন একটিভিটির মাধ্যমে শেখানো হয়। প্রি-স্কুলে শিশুরা ছোট ছোট নির্দেশনা মানা এবং বন্ধুদের সঙ্গে মেশার মাধ্যমে শেখে। এসব একটিভিটির মাধ্যমে তারা ভাষা, সংখ্যা, রং, আকার, নিয়ম-কানুন, অপেক্ষা করা, নিজের দায়িত্ব বুঝে নেয়া ,কথা বলা এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখে ফেলে। এককথায় প্রি-স্কুলের আসল কাজ হলো শিশুকে স্কুলের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করা, তার আত্মবিশ্বাস বাড়ানো, অন্য শিশুদের সঙ্গে মেশার অভ্যাস তৈরি করা এবং ছোট ছোট কাজে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করা। তবে প্রি-স্কুল (Pre-school) এ দেয়ার আগে শিশু কতটা প্রস্তুত সেটাও বুঝে নেয়া জরুরি। কারণ বাসার বাইরে একটা লম্বা সময় থাকতে হয় তাকে।
এই কারণেই প্রি-স্কুলে ভর্তির আগে শিশুর Pre-school Readiness বা প্রি-স্কুলের জন্য প্রস্তুতি বোঝা জরুরি।
এই ব্লগে আমরা ৫টি নিয়মের মাধ্যমে আপনার সন্তান প্রি-স্কুলের নতুন অভিজ্ঞতার জন্য কতটা প্রস্তুত তা যাচাই করব।

প্রি-স্কুলে আপনার সন্তানকে দীর্ঘ সময় বাবা-মা থেকে দূরে থাকতে হবে। বাসায় থাকলে তার চাহিদা সবাই সহজেই বুঝে যায়। কিন্তু স্কুলের নতুন পরিবেশে তাকে নিজের কথা নিজেকেই বলতে হবে। সে কি তার প্রাথমিক প্রয়োজনগুলো বোঝাতে পারবে? যেমন পানির পিপাসা পাওয়া, ক্ষুধা লাগা বা টয়লেটে যাওয়ার কথা অন্যকে বুঝিয়ে বলতে পারবে? এই বিষয়গুলি বোঝা জরুরি।
যদি দেখেন সে ছোট ছোট বাক্যে তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারছে, তবে বুঝবেন সে Pre-school Readiness-এর প্রথম ধাপটি সফলভাবে পার করে ফেলেছে। আপনার শিশু যখন অন্যের কাছে নিজের প্রয়োজন স্পষ্ট করতে পারে, তখন তার স্কুলে যাওয়ার ভয় বা Pre-school Admission অথবা Pre-school Readiness নিয়ে আপনার দুশ্চিন্তাও অনেকটা কমে যাবে।
তবে মনে রাখবেন, শুরুতে সব শিশুই কিছুটা Separation Anxiety’তে ভোগে এবং কিছুটা কান্নাকাটি করতে পারে। এটা নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। এটা বিকাশের একটি স্বাভাবিক অংশ। যদি দেখেন যে শিশু এখনো আপনার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল, তাহলে সরাসরি প্রি-স্কুলে পাঠানোর আগে তাকে নিয়ে ছোট ছোট প্লে -ডে (Play-day) আয়োজন করতে পারেন। এতে করে Pre-school Admission-এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে তার মনে স্কুলের পরিবেশ নিয়ে একটি ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।

প্রি-স্কুলে আপনার সন্তানকে একটি বড় গ্রুপের মধ্যে থাকতে হবে। শিক্ষকরা এখানে শিশুদের দলগতভাবে বিভিন্ন কাজ করাবেন। তিনি বলতে পারেন, "সবাই গোল হয়ে বসো," "খেলনাগুলো ঝুড়িতে রাখো," কিংবা "এখন হাত ধোয়ার সময়।" আপনার সন্তান কি বাড়িতে আপনার দেয়া এই ধরনের ছোট ছোট এবং সহজ নির্দেশগুলো বুঝতে পারে এবং তা পালন করার চেষ্টা করে?
যদি দেখেন সে আপনার কথা শুনে সাড়া দিচ্ছে এবং অন্তত একটি বা দুটি ধাপের নির্দেশনা অনুসরণ করতে পারছে, তবে বুঝবেন সে ক্লাসরুমের পরিবেশের জন্য প্রস্তুত। বড় কোনো কাজ নয়, সাধারণ শিষ্টাচারমূলক কাজ ও মনোযোগ দিতে পারলেই ধরে নেয়া যাবে তার Pre-school Readiness আছে। আপনি যদি তাকে নিয়ে কোনো Online preschool classes-এ অংশ নেন, তবে দেখবেন সেখানেও এই ইনস্ট্রাকশন মেনে চলার বিষয়টি কতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি তার মধ্যে নিয়মানুবর্তিতা তৈরি করে। Pre-school Admission-এর পর সে যখন কিন্ডারগার্টেনে তার পড়াশোনা শুরু করবে, তখন এই স্কিলগুলি অনেক কাজে আসবে।

পার্কে বা কোনো ঘরোয়া দাওয়াতে গেলে আপনার শিশু কি একা থাকতে পছন্দ করে, না কি অন্য শিশুদের সাথে খেলতে চায়? সে কি তার প্রিয় খেলনাটি অন্যের সাথে শেয়ার করে? খেলার সময় নিজের সিরিয়াল আসার জন্য অপেক্ষা করতে শেখে? প্রি-স্কুল এ তার এই ধরনের সামাজিক মেলামেশার হাতেখড়ি হবে।
যদি সে অন্য শিশুদের সাথে ভাব করার আগ্রহ দেখায় এবং অন্যদের উপস্থিতি উপভোগ করে, তাহলে তার মধ্যে Pre-school Readiness আছে বলা যায়। প্রি-স্কুলে পড়াশোনার চেয়ে এই বিষয়গুলিই বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশতে মিশতে তার সহানুভূতি এবং ধৈর্য গড়ে তোলার প্রথম পাঠ নেয়া হয়ে যাবে।

প্রি-স্কুলে ভর্তির আগে শিশুর মধ্যে কিছু প্রাথমিক স্বনির্ভরতা থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ নিজে নিজে কিছু কাজ করা শিখতে হবে। এর মানে এই না যে তাকে সব কাজ একাই করতে হবে। ছোট ছোট কাজ শিখে নিলেই হবে। যেমন, সে কি নিজে নিজে পানি নিয়ে খেতে পারে? নিজের জুতো নিজেই পরতে পারে? প্রি-স্কুলে শিক্ষক ও সহকারী থাকলেও, শিশুর নিজের হাত পরিষ্কার করা বা নিজের টিফিন বক্সটি চেনার মতো ছোট ছোট কাজগুলো তাকে মানসিকভাবে অনেক এগিয়ে রাখবে।
এই ধরণের ছোট ছোট কাজ করার ক্ষমতা Pre-school Readiness-এর একটি অংশ। নিজের কাজ নিজে করতে পারলে শিশু স্কুলের নতুন পরিবেশে বেশি আত্মবিশ্বাসী বোধ করে। অনেক অভিভাবক ভাবেন স্কুলে দিলেই সব শিখবে, কিন্তু বাড়িতে এই চর্চাগুলো শুরু করলে Pre-school Admission-এর পর শিশুর স্কুলজীবন অনেক বেশি আনন্দময় হয়ে ওঠে।

প্রি-স্কুলে নানারকম একটিভিটিজ, যেমন গল্প শোনা, ছবি দেখা, ব্লক সাজানো, রং করা, ছড়া বলা ইত্যাদি থাকলেও টিচারের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয় কিছু সময়। আবার কোনো কোনো সময় তাকে বিভিন্ন টাস্ক শেষ করতে হয়। এসব কাজে তাকে অন্তত ৫-১০ মিনিট মনোযোগ দিতে হবে। আপনার সন্তান যদি অল্প সময়ের জন্য হলেও একটি কাজে মনোযোগ দিতে পারে, তাহলে বুঝবেন সে ক্লাসরুমের পরিবেশে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে পারবে।
তবে শিশু অতিরিক্ত চঞ্চল হলেও সমস্যা নেই। তাকে জোর করে বসিয়ে না রেখে বাসায় ছোট ছোট মনোযোগের খেলা শুরু করতে পারেন। যেমন, ৫ মিনিট গল্প শোনা, ৩টি ব্লক সাজানো, একই রঙের জিনিস আলাদা করা, বা একটি ছবি রং করা। ধীরে ধীরে এই অভ্যাসই তার Pre-school Readiness বাড়াতে সাহায্য করবে।
১। প্রি-স্কুলে কেন দিব? না দিলে কী সমস্যা হতে পারে?
প্রি-স্কুল শিশুর Social skills বা সামাজিক মেলামেশার দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে দারুণ সাহায্য করে। এটি শিশুকে একটি নির্দিষ্ট রুটিনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, যা পরবর্তী বড় স্কুলের চাপের জন্য তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে তোলে। প্রি-স্কুল শেখার প্রতি আগ্রহ তৈরির একটি সুন্দর মাধ্যম।
২। প্রি-স্কুলে ভর্তির সঠিক বয়স কোনটি?
সাধারণত আড়াই থেকে সাড়ে তিন বছর বয়সে শিশুদের প্রি-স্কুলে দেওয়া হয়। তবে বয়স দেখার চেয়ে শিশুর Pre-school Readiness যাচাই করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি শিশুর বিকাশের গতি আলাদা, তাই আপনার সন্তানের মানসিক বিকাশ বুঝে সিদ্ধান্ত নিন।
৩। আমার শিশু অনেক চঞ্চল, এটা কি প্রি-স্কুলের জন্যে সমস্যা ?
প্রি-স্কুল মূলত তৈরিই করা হয় আপনার শিশুর চঞ্চলতাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর জন্য। সেখানে খেলাধুলার ছলে এমনভাবে শেখানো হয় যাতে শিশুর একঘেয়ে না লাগে। যদি দেখেন সে বাড়িতে অন্তত ৫-১০ মিনিট কোনো কাজে মনোযোগ দিতে পারছে, তবে বুঝবেন সে প্রি-স্কুলের পরিবেশের জন্য ধীরে ধীরে প্রস্তুত হচ্ছে।
৪। ঢাকায় ভালো প্রি-স্কুল খুঁজে পাওয়ার উপায় কী?
আপনার বাসার কাছাকাছি ভালো Pre school in Area খুঁজে পেতে গুগল ম্যাপের সাহায্য নিতে পারেন। সরাসরি স্কুল ভিজিট করে সেখানকার পরিবেশ, শিক্ষকদের আচরণ এবং নিরাপত্তার বিষয়টি যাচাই করে নিন। অন্য অভিভাবকদের রিভিউ এবং স্কুলের শিক্ষা পদ্ধতি যেমন মন্টেসরি মেথড ব্যবহার করা হয় কি না, এসব আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
৫। অনলাইনে প্রি-স্কুল কোর্স করা যায় কি?
হ্যাঁ, এখন ঘরে বসেও অনলাইনে প্রি-স্কুল কোর্স করা যায়। বিশেষ করে যেসব শিশু এখনো সরাসরি স্কুলে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়, তাদের জন্য অনলাইন প্রি-স্কুল কোর্স খুবই ভালো অপশন হতে পারে। এতে শিশু ঘরের নিরাপদ ও পরিচিত পরিবেশে থেকে ধীরে ধীরে শেখার রুটিন, শিক্ষককে অনুসরণ করা, ছোট ছোট নির্দেশনা মানা, ছড়া, গল্প, রং, সংখ্যা, ভাষা ও সামাজিক আচরণের মতো বিষয়গুলোর সাথে পরিচিত হতে পারে।
আপনার সন্তান প্রি-স্কুলের জন্যে কতটা প্রস্তুত এটা জানতে আমাদের Early Learning Assessment এর জন্যে রেজিস্ট্রেশন করতে পারেন।
আর অনলাইন প্রি-স্কুলিং এর অভিজ্ঞতা লাভ করতে যুক্ত হতে পারেন Pre-school at home (ঘরে বসে প্রি-স্কুলিং) ফেসবুক গ্রুপে।
আপনার সন্তানের শেখার যাত্রা আনন্দময় হোক।